“ব্যাঙ্কারে কিশোরী মেয়েটিকে বিবস্ত্র অবস্থায়,আমরা মুক্তিযোদ্ধারা বোবা কান্নায়” ৭১’র স্মৃতিচারণে -বীরমুক্তিযোদ্ধা আবুল কাশেম - Simanto Times
Latest:
simantotimes24

Today: 22 Oct 2021 - 06:39:41 pm

“ব্যাঙ্কারে কিশোরী মেয়েটিকে বিবস্ত্র অবস্থায়,আমরা মুক্তিযোদ্ধারা বোবা কান্নায়” ৭১’র স্মৃতিচারণে -বীরমুক্তিযোদ্ধা আবুল কাশেম

Published on Monday, December 21, 2020 at 5:33 am 447 Views

হামিদা আক্তার স্মৃতি : সীমান্তুটাইস ২৪ডট কম অনলাইন পত্রিকার সাথে  ৭১’র সূর্য্য সৈনিক বীরমুক্তিযোদ্ধা মোঃ আবুল কাশেম এর সাথে একান্ত আলাপ চারিতায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণে কিছুক্ষণ। ৭১’র বীরমুক্তিযোদ্ধা যা বলেন তাই তুলে ধরা হলো এখানে । মতামতের জন্য  সম্পাদক মন্ডলী কোন ভাব দায়ী নয় । বীরমুক্তিযোদ্ধার কথপোকথনে-

যেভাবে যাই আমি স্বাধীনতা যুদ্ধে

আমি ১৯৬৯ সালে তৎকালীন রংপর মহকুমার বর্তমানে নীলফামারী ছমির উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীতে অধ্যায়নরত অবস্থায় বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে ৬ দফা আন্দোলন চালিয়ে যাই। সে সময়েই আমি ছাত্রলীগে যোগদান করে সংগঠনের সাথে জড়িয়ে পড়ি। এভাবেই চলছিলো অধ্যায়ন জীবন। ১৯৭০ সালে আমি দশম শ্রেনীতে পড়ছিলাম। পাকিস্তানের জলুম নির্যাতনের বিরুদ্ধে চলছিলো সংগ্রাম আন্দোলন। পাকিস্তানীরা আমাদের তথা বাংগালীদের উপড় চালাতে থাকে নির্মম নির্য়াতন, অত্যাচার ও জুলুম। দিনে দিনে বেড়েই চলছিলো তাদের অসহনীয় জুলুম আর অত্যাচার। তৎকালীন সময়ে বাংগালীদের মহানায়ক অকুতোভয় নেতা বঙ্গবন্ধু দেশের মানুষের উপড় আস্তা রেখেই ১৯৭১’র ৭ই মার্চ ভাষণে বলেন “ এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম”। সেই ভাষণে আমি উজ্জীবিত হয়ে মনের মধ্যে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকি। এদিকে পশ্চিম পাকিস্তানীদের তথা পাক বাহীনির জুলুম নির্যাতন নিপিড়ন এবং নৃসংশতা বেড়েই চলছিলো দিনের পর দিন। শুরু করলো (তারা) পাকিস্তানীরা অসহায় মা-বোনদের উপড় নানা রকম জুলুম ও নির্যাতন। দিনে দিনে বেড়েই চলছিলো মা-বোনদের প্রতি নিমর্ম নির্যাতন। আত্মীয় স্বজনরাও একে একে তাদের হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হতে লাগলো। এদিকে ১৯৭০ সালের শেষের দিকে বেছে বেছে যুবকদের বিশেষ করে স্কুল কলেজের ছাত্রদের উপড় পাকিস্তানীদের অসহনীয় নির্যাতন, গ্রেফতার ও আটক বেড়েই চলছিলো। দেশের এসব যুবকদের আটকের খবর দেশের সবখানেই ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। এ খবরে আমিও পড়াশুনা ছেড়ে গ্রামের বাড়ীতে পালিয়ে আসলাম। বয়সে তখন আমি ১৫-১৬ বছরের টকবকে যুবক। যুবতী কিশোরী মেয়েদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তানীরা এ খবরে আমাদের এলাকা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে লুকিয়ে রাখতে শুরু করলো কিশোরী মেয়েদের। আমি গ্রামের লেখাপড়া জানা যুবক ছেলে। আমার জেঠাতো বোনের সাথে (১৯৭০ সালের শেষের দিকে) আমার বিয়ে দেওয়া হলো পাকিস্তানীদের হত থেকে বাঁচাতেই। শিশুকালেই আমার বাবা-মাকে হারিয়েছি। গর্ভধারীনি মা জন্ম দিয়েই পরলোকগমন করেছিলো। ৩/৪ বছর বয়সে আমার বাবা চলেন যান না ফেরার দেশে। আমার অভিভাবক বলতে বড় ভাই আর আর বড় বোন। জেঠির বুকের দুধ খেয়েই বড় হয়েছি আমি। এরই মধ্যে দেশ ও দেশের মানুষকে মুক্ত করতেই প্রতিজ্ঞা করি দেশের এই ক্লান্তি লগ্নে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করবো। পাকিস্তানীদের জুলুম অত্যাচারে যখন এদেশের মানুষ অতিষ্ঠ ঠিক তখনই মনের মধ্যে আগুন জ্বলে প্রতিশোধের নেশায়। নববিবাহিত বউকে না জানিয়ে শুধু আমার বাবার মত বড় ভাইকে চুপ করে বলেই চলে যাই স্বাধীনতা সংগ্রামে।

৭১’র মুক্তিযুদ্ধে যুদ্ধকালীন সময়ে আমার সহযোদ্ধা
০১। বীরমুক্তিযোদ্ধা মোঃ লতিফর রহমান, পিতা- মৃত আবুল হোসেন, গ্রাম-দোহলপাড়া, ডাকঘর-খগাখড়িবাড়ী, ইউনিয়ন-খগাখড়িবাড়ী , উপজেলা- ডিমলা, জেলা- নীলফামারী-বিভাগ- রংপুর । ভারতীয় তালিকা নম্বর-৪১৩৪০,বডি নম্বর- ১৪৫/৩৭, লাল মুক্তিবার্তা নম্বর- ০৩১৫০২০১১১, গেজেট নম্বর- ৫৮৭ । ০২। বীরমুক্তিযোদ্ধা মোঃ তৈয়ব আলী, পিতা- মৃত আইন মন্ডল, গ্রাম-ঠাকুরগঞ্জ, ডাকঘর-দ্বারাজগঞ্জ, ইউনিয়ন-পশ্চিম ছাতনাই , উপজেলা- ডিমলা, জেলা- নীলফামারী-বিভাগ -রংপুর ।  ভারতীয় তালিকা নম্বর- ৪১৩৩৬,বডি নম্বর- ১৪৫/৪০,  ০৩। বীরমুক্তিযোদ্ধা মুত আব্বাস আলী, পিতা- মৃত টুরু মামুদ, গ্রাম-দক্ষিণ তিতপাড়া, ডাকঘর- ডিমলা, ইউনিয়ন- ডিমলা , উপজেলা- ডিমলা, জেলা- নীলফামারী- বিভাগ- রংপুর । ভারতীয় তালিকা নম্বর- ৪১৩৩৫,বডি নম্বর- ১৪৫/৪২, লাল মুক্তিবার্তা নম্বর-০৩১৫০২০০৮৪, গেজেট নম্বর-৫৮১ । ০৪। বীরমুক্তিযোদ্ধা মোঃ হাফিজার রহমান, পিতা -মৃত মটু মামুদ, গ্রাম-খগাখড়িবাড়ী, ডাকঘর-খগাখড়িবাড়ী, ইউনিয়ন- খগাখড়িবাড়ী , উপজেলা-ডিমলা, জেলা-নীলফামারী-বিভাগ-রংপুর । ভারতীয় তালিকা নম্বর- ৪১৩৩২,বডি নম্বর-১৪৫/৩৫ লাল মুক্তিবার্তা নম্বর- ০৩১৫০২০২০০, গেজেট নম্বর-৬৮০। ০৫। বীরমুক্তিযোদ্ধা মোঃ ইমান আলী, পিতা- মৃত আজিমুদ্দিন, গ্রাম-ছাতনাই, ডাকঘর- ছাতনাই, ইউনিয়ন-পূর্ব ছাতনাই , উপজেলা-ডিমলা, জেলা- নীলফামারী- বিভাগ- রংপুর ।  ভারতীয় তালিকা নম্বর- ৪১৩৩৮,বডি নম্বর-১৪৫/৩৯, লাল মুক্তিবার্তা নম্বর- ০৩১৫০২০১১৭, গেজেট নম্বর- ৫৮৮।০৬। বীরমুক্তিযোদ্ধা মোঃ আব্দুল মজিদ, পিতা-মৃত কফর উদ্দিন, গ্রাম-নাউতারা নিজপাড়া, ডাকঘর-নাউতরা, ইউনিয়ন-নাউতারা , উপজেলা-ডিমলা, জেলা- নীলফামারী- বিভাগ- রংপুর ।  ভারতীয় তালিকা নম্বর- ৪১৩৩৪,বডি নম্বর- ১৪৫/৪৩, লাল মুক্তিবার্তা নম্বর- ০৩১৫০২০০১২, গেজেট নম্বর-৫৮৭ ।
০৭। বীরমুক্তিযোদ্ধা মোঃ জয়নাল আবেদীন, পিতা মোঃ রহিমমুদ্দিন , গ্রাম- কালিগঞ্জ, ডাকঘর- দ্বারাজগঞ্জ, ইউনিয়ন- পশ্চিম ছাতনাই , উপজেলা- ডিমলা, জেলা- নীলফামারী-বিভাগ-রংপুর । ভারতীয় তালিকা নম্বর-৪১৩৩৯,বডি নম্বর- ১৪৫/৩৮, লাল মুক্তিবার্তা নম্বর-০৩১৫০২০১১১, গেজেট নম্বর- ৫৭০।০৮। বীরমুক্তিযোদ্ধা মোঃ রফিকুল ইসলাম, পিতা- মৃত সহিমুদ্দিন, গ্রাম- কালিগঞ্জ, ডাকঘর- দ্বারাজগঞ্জ, ইউনিয়ন- পশ্চিম ছাতনাই, উপজেলা- ডিমলা, জেলা- নীলফামারী-বিভাগ-রংপুর । ভারতীয় তালিকা নম্বর- ৪১৩৩৭,বডি নম্বর- ১৪৫/৪৯, লাল মুক্তিবার্তা নম্বর-০৩১৫০২০০৯৬, গেজেট নম্বর-৬৯১। উল্লেখিত সহযোদ্ধারা ছাড়াও আরো অনেকেই ছিলো আমার সাথে দেশের ৭১’র স্বাধীনতা যুদ্ধে ।

প্রশিক্ষণের দিনগুলি
১৯৭১ সালের প্রথম সপ্তাহে হবে যতদুর মনে পড়ে। মুক্তিবাহীনিতে যোগদানের জন্য ডিমলা সীমান্তের ঠাকুরগঞ্জ বাজারের পাশের্^ই আওয়ামীলীগের তৎকালীণ এমপি মোঃ আব্দুর রহমান চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করি। তিনি ভারতের দেওয়ানগঞ্জে “মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ ইনক্লুড ক্যাম্প” পাঠিয়ে দেন। সেখানেই আমাদের অনেককেই ভর্তি করানো হলো। দেওয়ানগঞ্জেই ইনক্লুড ক্যাম্পে থাকলাম ১০/১২দিন। এ দেশ থেকে যাওয়া আমার সাথে থাকা বরিমুক্তিযোদ্ধারা ছাড়াও আরো অনেকেই উপস্থিত হলো মুক্তিযোদ্ধা ইনক্লুড ক্যাম্পে। এরপর ভারতীয় সেনাবাহীনি আমাদের নিয়ে যায় ভারতের “রায়গঞ্জ ইয়ুথ ক্যাম্প”। সেখানেই আরো ১০/১২দিন অবস্থান করি। এ সময় আমাদেরকে ইয়ুথ ক্যাম্পেই প্রাথমিক ভাবে পিটি প্যারেড শেখানো হয়। সেখান থেকে আমাদের প্রায় সহস্রাধিক মুক্তিবাহীনিকে ভারতীয় সেনাবাহীনির গাড়িবহরে প্রায় ৬/৭ শত কিলোমিটার দুরে থাকা মুক্তিক্যাম্প (মুজিব ক্যাম্প) নিয়ে যাওয়া হয়। আর এই মুজিব ক্যাম্পটি ছিলো পাহারে ঘেরা। শতশত উচু নিচু রাস্তা পাড়ি দিয়ে সেখানে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়। গাড়ী বহরে থাকা সকল মুক্তিবাহীনির মনের মধ্যে একটাই নেশা প্রতিশোধ আর প্রতিশোধ। প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে যাবো যুদ্ধ করবো জালিমদের বিরুদ্ধে। জায়গাটি কোথায় কিউ বুঝতে পারছিলাম না। কেউ বলেও না। যুদ্ধ যাওয়ার নেশা যেন অস্থির করে তুলেছে মনকে। তাই জানার ইচ্ছাও হারিয়ে ফেলেছি। জায়গার সঠিক নামটিও আমাদের জানানো হয়নি। মুজিব ক্যাম্পে যাচ্ছি এটুকুই জানতে পেরেছিলাম। ক্যাম্পটি ছিলো পাহাড়ের উপরে। ক্যাম্পে পৌছি গেলাম। গিয়েই দেখতে পেলাম আমাদের পূর্বেই সেখানে আরো কয়েকটি গ্রæপ সেখানে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। ইতিমধ্যে তাদের ব্যাচের প্রশিক্ষণও শেষ। তাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য দেশে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছিলো। আমাদেরকে ভর্তি করার সকল প্রক্রিয়া শেষ করা হলো। সেখানে ৮টি কোম্পানীর ট্রেনিং সেড ছিলো। আমাদের নতুন কোম্পানী গুলোর নাম করণ করা হলো আলফা, ডালডা, ব্রেভো ও চাল্লিসহ নানা নামে। আমাদেরকে ৪/৫ দিন নিয়োমিত সাধারণ কিছু প্রশিক্ষণ করিয়ে পাঠানো হলো ব্রেভো কোম্পানীতে। ২০০ জনকে এক সাথে একটি কোম্পানীতে ভাগ করা হয়েছিলো। প্রতিটি কোম্পানীতে ১ জন কোম্পানী কমান্ডার, ৪ জন প্লাটুন কমান্ডার । প্রত্যেক প্লাটুনে ৫০ জন মুক্তিবাহীনি প্রতি প্লাটুনে থেকে ১১ জন করে একটি সেকশনে ভাগ করা হয়। প্রতি সেকশনে ১ জন সেকশন কমান্ডার করা হয়। আমি সেকশন কমান্ডার হলাম। আমাদের কোম্পানীটি নিয়ে যাওয়া হলো ৭০/৭৫ কিলোমিটার দুরে চীন সীমান্তে। প্রশিক্ষণ চলাকালীণ সময়ে একজন প্রশিক্ষক বলছিলেন আমরা চীনের প্রাচীর সংলগ্নে আছি। সেখানেই ২৮টি দিন ধরে বিভিন্ন প্রকার হাতিয়ার চালানো ও যুদ্ধের বিভিন্ন কোলা কৌশলের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। আমিও রপ্ত করতে থাকি যুদ্ধ কৌশল আর হাতিয়ার প্রশিক্ষণ। আমার বুকের ভিতর তখনও জ¦লছে প্রতিশোধের আগুন। ভাবছি ট্রেনিং শেষ হলেই আমি যাবো যুদ্ধের ময়দানে রক্ষা করবো দেশ মাতৃকাকে মুক্ত হবো পাকিস্তানীদের হাত থেকে। প্রশিক্ষণে রপ্ত করতে থাকি যেসব সমরাস্ত্র হাতে নিয়েছি থ্রিনট থ্রি রাইফেল, মারফোর্ট থার্ট, বোল্ডডেকশন ও ফোর মার্ক থার্ড রাফফেল। এছাড়াও অ্যাসেলার, স্টেনগান ও এলএমজির প্রশিক্ষণ দুর পাল্লার ভারী অস্ত্র। শুধু তাই নয় মেশিনগান মোম্ব, স্পোলোজিব গ্রেনেডের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয় আমাদেরকে। ব্রেভো কোম্পানীতে যারা আমরা প্রশিক্ষণ নিয়েছি তারা সকলেই প্রশিক্ষণে উর্ত্তীন্ন হয়ে ফায়ারিং স্পডে বাস্তব ব্যবহারে আমরা সকলেই সফল হই। সাফল্য অর্জন করায় আমাদের প্রত্যেকের নাম ঠিকানা বডি নম্বরসহ ছবি তুলে যাবতীয় তথ্য মুক্তিবাহীনির রেজিষ্টার পাকা খাতায় অন্তর্ভূক্ত করে নিজ নিজ অস্ত্র হাতে দিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর গাড়িতেই স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহনের জন্য পূর্বপাকিস্তানের রংপুরস্ত বুড়িমারী ৬ নং সেক্টরে পৌছে দেওয়া হয় (এখানে জানিয়ে রাখি-আমার বডি নম্বর-১৪৫/৩৬, ভারতীয় তালিকা নম্বর-৪১৩৩৩) ১৯৭১ সালে নভেম্বরের দিকে বুড়িমারীর ৬ নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার মেজর এম.কে বাশার (মোহাম্মদ খাদেমুল বাশার ) আমাদের গ্রহণ করেন।
৭১’র যুদ্ধক্ষেত্র
আমাদেরকে খুব দ্রæত বিভিন্ন সেকশনে অর্ন্তভূক্ত করেন। বুড়িমারী মুক্তিযোদ্ধা হেডকোয়াটারে ১ দিন থাকার পরে অর্থাৎ দিবাগত রাতেই সিনিয়র মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে আমরা এক প্লাটুন নতুন মুক্তিযোদ্ধারা যুক্ত হয়ে ঐ রাতেই যুদ্ধ কৌশল সম্পর্কে দিক নির্দেশনা পেয়ে বুড়িমারী থেকে বাউরায় পাকসেনা ক্যাম্পে আক্রমন চালাই। এরপরেই আমাদের টহল বাহীনি বাউরায় অবস্থান করছিলো। টহল বাহীনির কাছ থেকে শত্রæবাহীনির অবস্থান ও গতিবিধি জেনে আমাদের দল কিছুদুর অগ্রসর হয়ে হাইকমান্ডের নির্দেশে ৩ ভাগে ভাগ হয়ে যুদ্ধের ( অ্যাম্বুস) ফাঁদপাতি। একই সময়ে পূর্ব,পশ্চিম ও উত্তর দিকে থেকে হামলা করা হবে। দক্ষিনে অবস্থান নেওয়া হয়নি। সোর্স বলেছে দক্ষিনে শত্রæবাহীনির অবস্থান ছিলো না। এবার যুদ্ধকালীণ বমান্ডারের নিদের্শে প্রথমে উত্তর দিকে শত্রæর ঘাটিতে ফায়ারিং শরু করা হয়। ৪/৫ মিনিটি ফায়ারিং করেই কিছু সময় নিরব। তারপর পশ্চিম দিকে শুরু করা হয় ফায়ারিং। আবার কিছু সময় নিরব। এবার পুর্ব দিক থেকে ফায়ারিং। এভাবেই সারারাত শেষে ভোররাত পর্যন্ত চলতে শত্রæর ঘাটিতে আঘাত। সূর্য্য উদতি হওয়ার পূবেই আমরা চলে আসি মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে। পাকবাহীনি শত্রæরা ভয়ে ভীতস্ত্র হয়ে পড়ে। এভাবেই চলতে থাকে শত্রæবাহীনির ঘাটিতে আঘাত বেশ কয়েকদিন ধরে। এভাবে হামলার ফলে পাকবাহীনি সেখান থেকে পিছু হটে অনত্র সরে যায়। দখল করি শত্রæর ঘাটি। বাউড়া হামলার ৪/৫দিন পর আমরা হাতিবান্দা পাকসেনা ক্যাম্পে হামলা চালাই। ২দিন হামলার পর সেখানে মুক্তিবাহীনির অন্য একটি প্লাটুন মোতায়েন করে আমরা বিশ্রামের জন্য ফিরে আসি বুড়িমারি মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে। আমরা আবারও চলে যাই হাতিবান্দা পাক সেনা ক্যাম্প আক্রমনে। সারারাত আক্রমন চালাই। আমাদের প্রচন্ড আক্রমনের ফলে শত্রæবাহীনি পাকসেনারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। প্রভাত হলে আমরা পাক সেনাঘাঁটি ফাঁকা দেখে ব্যাঙ্কারগুলো ধ্বংস করতে গিয়ে ব্যাঙ্কারে ১০/১১ বছরের একটি কিশোরী মেয়েকে বিবস্ত্র ও অজ্ঞান অবস্থায় দেখতে পাই। এ সময় মর্মান্তিক বিভৎস ট্রাজেডিক এই দৃশ্যে অমরা সকলেই (মুক্তিযোদ্ধা) বোবা কান্নায় আছন্ন হয়ে পড়ি। পরে অমরা মেয়েটিকে কাঁধে করে নিয়ে আসি বুড়িমারী হেডকোয়াটার মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে। কিশোরী মেয়েটিকে চিকিৎসা প্রদান করা হয়ে ১দিন পর জ্ঞান ফিরে পেলেও বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছে সে। হয়ত আর কোনদিন সে চিৎকার করবে না। কথাও বলবে না। আমি সে দিনের সেই মেয়েটির কথা আজো ভূলতে পারিনি। সহযোদ্ধারাও পারেনি আমার বিশ্বাস। এই দেশের জন্য তার আত্মত্যাগ কোন দিন ভূলা কি যায় ? মেয়েটির প্রতি পাক সেনাদের এই নির্মম আচরণে সেদিন আরো বেশি তেজদিপ্ত হয়ে উঠি। মনের মধ্যে আরো বেশী প্রতিশোধের আগুন জ্বলতে থাকে। অশ্রুসিক্ত নয়নে সেদিন সকলেই আমরা মুক্তি ক্যাম্পে কিছুক্ষনের জন্য নিথর হয়ে যাই। আর সকলেই শপথ গ্রহণ করি জীবনের শেষ রক্ত বিন্দু দিয়ে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে আমার এই বোনের সম্ভ্রমের প্রতিশোধ নিবোই। নভেম্বর মাস শেষ হলো ডিসেম্বর মাসে প্রথম সপ্তাহে বেশকিছু অপারেশন করি আমরা। টহলে থাকি সারাক্ষণ। খবর পাই পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে আসার সমস্তপথ বন্ধ করে দিয়েছে মুক্তিযোদ্ধা ভাইয়েরা। বিশেষ করে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সিংহল হয়ে পূর্ব পাকিস্তান আসার সমস্ত পথ বন্ধ করা হয়েছে। এ খবর শুনে কিছুটা স্বস্থির নিশ্বাস ফেলি আমরা। বুকের ভিতর আশার আলো সঞ্চারিত হয়। এদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধি এক গোপন নির্দেশে ভারতের সেনাবাহীনিকে মুক্তিবাহীনির সাথে মিত্রবাহীনি হিসেবে যুদ্ধে অংশগ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। এ সংবাদে আমরা আরো নব উদ্দীপনায় গর্জে উঠি। এরই মধ্যে সেক্টর কমান্ডার মেজর এম.এ বাশার এর নির্দেশনায় আমরা নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে স্বশস্ত্র সংগ্রামে অংশগ্রহনের অনুমতি পাই। ফলে ডিসেম্বর এর দ্বিতীয় সপ্তাহের দিকে আমরা বুড়িমারী হেড কোয়াটার থেকে গাড়ি বহলে মুক্তিযোদ্ধারা নীলফামারীর চিলাহাটি সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন ইকবাল রশিদ এর অধীনে চিলাহটিতে অবস্থান নেই। অনুমান ৭/৮ ডিসেম্বর সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন আমাদের যুদ্ধের দিক নির্দেশনা প্রদান করে ভারতীয় মিত্রবাহীনিসহ যুদ্ধনীতি ও কলাকৌশল তৈরী করে সবাইকে বুঝিয়ে দেন। সেদিন সমস্ত যুদ্ধের কার্যক্রমকে চার স্তরে ভাগ করা হয়। আকাশ পথে দুই ভাগ ও পদাতিক পথে দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়। প্রত্যেকের যুদ্ধাস্ত্র/সমরাস্ত্র পরীক্ষা নিরীক্ষা করে ও ব্যারেল ওয়াশ করে যুদ্ধের উপযোগী করে নেওয়া হয়। সন্ধায় হালকা খাবার খেয়ে সামান্য বিশ্রাম নিয়ে আমাদের প্লাটুনের কিছু মুক্তিযোদ্ধা টহলে যাই। টহল বাহীনি যুদ্ধের স্থান ও দিক নির্ধারণ করে সাব সেক্টরে খবর দিলে অনুমান রাত আড়াইটার দিকে আমরা মির্জাগঞ্জ পাকসেনা ক্যাম্পে আক্রমনের প্রস্তুতি নেই। মিত্র বাহীনির সদস্যরা আর্টিলারি ভারী অস্ত্র নিয়ে আমাদের পিছনে কৌশলগত অবস্থান নেন। হাই কমান্ডের নির্দেশ ছিলো শত্রæবাহীনি যেন আমাদের সংখ্যায় কম অনুধাবন করে সে জন্য হালকা ফায়ারিং করে আমরা শত্রæ বাহীনিকে আক্রমন চালাই। আমরা কৌশল নিয়েছিলাম শত্রæবাহীনি আমাদের সংখ্যায় কম ভেবে বের হয়ে আসলেই আমরা চারিদিকে এক সাথে আক্রমন চালাবো,পরাজিত করবো তাদের। কিন্তু তারা বের হয়ে আসেনি। এভাবেই ঐদিন রাত কেটে যায়। মিত্রবাহীনির ওয়ার্লেস অফিসার এর নির্দেশনায় পরেরদিন সকালে মাথার উপরে হেলিকপ্টার দেখে মনের মধ্যে চাপা আনন্দে আমরা সকলেই মূর্হুতের মধ্যে মিত্রবাহীনির যুদ্ধ বিমানে হামলা চালায় শত্রæবাহীনি পাক সেনার ঘাটিতে। এসময় আমরাও আমাদের সাথে থাকা আর্টিলারি ভারী অস্ত্র দিয়ে হমালা করি। মুর্হুতেই শত্রæর ঘাটি এলোমলো হয়ে যায় পিছু হটতে থাকে শত্রæবাহীনি পাকসেনারা। টানা ৩/৪ ঘন্টা যুদ্ধ করার পর আমরা হাই কমান্ডের নির্দেশে মুক্তিবাহীনির ব্যারাকে ফিরে আসি। পরের দিন একই ভাবে ডোমার ও মির্জাগঞ্জে পাকসেনার ঘাটিতে আক্রমন চালাই। খবর পাই আমাদের লাগাতার আক্রমনে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে শত্রæবাহীনি পাকসেনারা পিছু হটেছে তরনীবাড়ী ও নীলফমারীতে অবস্থান নিয়েছে। খবর সঠিক ছিলো না ফলে আমরা ৩/৪দিন চিলাহাটি সাব সেক্টরেই থাকলাম। পরে আমরা ধারনা করেই তরনীবাড়ীর দিকেই রওনা হলাম। উদ্দেশ্য আমরা নীলফামারী ও তরণীবাড়ী আক্রমন করবো পাকসেনাদের ঘাটিতে। কিন্তু সেখানে গিয়ে জানতে পারি পাকসেনারা দারোয়ানীতে অবস্থান নিয়েছে। আমরা দারোয়ানীর দিকে হাটতে থাকি পথিমধ্যে লোক মারফত জানতে পারি তারা সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্ট এ অবস্থান নিয়েছে। খবর নিয়ে জানতে পারি প্রকৃত পক্ষেই পাকসেনারা সৈয়দপুরে ক্যান্টনমেন্ট এ অবস্থান নিয়েছে। পরে হাই কমান্ডের নির্দেশে আমরা নীলফামারী ট্রেজারিতে অবস্থানরত কিছু মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে এসে অবস্থান নেই। ঐদিনেই আবার হাই কমান্ডের নির্দেশ মিত্রওবাহীনি সহ আমাদের সৈয়দপুর ক্যান্টসমেন্ট আক্রমন চালাতে হবে। এ জন্য ক্যান্টনমেন্ট এলাকা ঘেরাও করে রাখতে হবে। ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম আমরা।
৭১’র বিজয় ও ঘরে ফেরা
ঠিক সেই মুহুর্তে খবর পেলাম পাক সেনারা স্যালেন্ডার করবে। এভাবেই বিভিন্ন তথ্যের আগাগোনায় আমাদের সেদিনের রাত অতিবাহিত হলো। পরের দিন অনুমান ১৪/১৫ ডিসেম্বর আমরা নীলফামারী নটখানায় আসলাম। এভবেই মনের মধ্যে আনন্দের ঝিলিক মৃদু মৃদু আকারে ভেসে উঠছে মনের মধ্যে। ভাবতে থাকি আমরা স্বাধীনতা অর্জন করতে যাচ্ছি। আর হয়ত কিছুদিনের মধ্যে। কিন্তু সেই প্রতীক্ষা আর করেত হলো না বেশিদিন। ১৬ ডিসেম্বর অনুমান ১২ টা কি সাড়ে ১২ টার দিকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে ঘোষনা আসে বাংলাদেশ মুক্ত স্বাধীন সার্বভৌমত্ব। পাকবাহীনি স্যালেন্ডার করবেন এই প্রস্তাব দিয়েছেন। এই ঘোষনা শুনেই আমরা আনন্দে মেতে উঠি এবং বিজয় মিছিলে নীলফামারীর মাটিকে সেদিন আনন্দোলিত করি সর্বস্তরের মানুষকে সাথে নিয়েই। আমরা মুক্তিযোদ্ধা একে অপরকে জড়িয়ে ধরি। সবার চোখে ক্যান্টনমেন্ট আনন্দ অশ্রু। মুখে হাসির ছাপ। নেচে গেয়ে দিনটি পার করি আমরা মুক্তিযোদ্ধারা। একই দিনে আমরা আমাদের কাঙ্খিত স্বপ পুরণ হয়। একই দিনে শত্রæবাহীনি পাকসেনারা আমাদের কাছে আত্মসর্মপন না করে মিত্র বাহীনির প্রধান জগজিৎ সিং অররা’র কাছে ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসর্মপন করেন পাকবাহীনি প্রধান। আমরা নীলফামারীর নটখানায় অবস্থান করি। এদিকে প্রায় ৬/৭ দিন সময় লেগে যায় শত্রæবাহীনিকে সরে নিতে। সেকারনে অমরাও সেখানেই থেকে যাই। শত্রæবাহীনি সরে গেলে আমরা মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র জমা দেই নীলফামারীর সাব কমান্ডার ক্যাপ্টেন ইকবাল রশিদ এর নির্দেশে। তিনি আমাদের সবাইকে রিলিজ সার্টিফিকেট দিয়ে নিজ নিজ ঘরে ফেরার নির্দেশ প্রদান করেন। রিলিজ পেয়ে আমার প্রত্যেকেই হাসিমুখে বীরের বেশে নিজেদের পরিবারে ফিরে আসি।

বীরমুক্তিযোদ্ধা মোঃ আবুল কাশেম
পিতা- মরহুম হাফিজ উদ্দিন
গ্রাম- কিসামত ছাতনাই, ডাকঘর- ছাতনাই, ইউনিয়ন- খগাখড়িবাড়ী
উপজেলা- ডিমলা, জেলা-নীলফামারী, বিভাগ-রংপুর
ভারতীয় তালিকা নম্বর- ৪১৩৩৩
বডি নম্বর- ১৪৫/৩৬
লাল মুক্তিবার্তা নম্বর- ০৩১৫০২০১১৫
গেজেট নম্বর- ৬৩৮, তাং-১৪/০৫/২০০৫ ইং
মোবাইল নম্বর -০১৭২৫৪৭৬১১৬

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *