প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া - Simanto Times
Latest:

Today: 28 Nov 2020 - 01:34:01 am

 প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া

Published on Saturday, October 24, 2020 at 2:59 pm 46 Views
    আদর্শ মানুষ ও জাতি গঠনে সুশিক্ষা
ওসমান গনি :
সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া দুটি ভিন্ন বৈশিষ্ট্য হলেও দুটিই শক্তিশালী গণমাধ্যম। আমাদের দেশে টিভি চ্যানেলের প্রসার ঘটার আগ পর্যন্ত সংবাদপত্রই ছিল প্রধান সংবাদমাধ্যম। এমনকি বিগত শতকে টেলিভিশনের বিপুল জনপ্রিয়তাও সংবাদপত্র বা মুদ্রিত গণমাধ্যমের সংহত অবস্থানকে কেউ নাড়াতে পারেনি। সে সময় টেলিভিশন সংবাদমাধ্যমের চেয়ে বিনোদন মাধ্যম হিসেবেই বেশি সমাদৃত ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিককালে অনেক ইলেকট্রনিক মিডিয়া ২৪ ঘণ্টাই সংবাদ পরিবেশন করে মুদ্রিত গণমাধ্যমকে এক ধরনের ঝুঁকিতে ফেলেছে। কেননা মানুষ কোন মাধ্যম থেকে খবরটি পেল, সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো কত দ্রুত খবরটি পাওয়া গেল। অস্বীকার করার উপায় নেই, বিশ্বব্যাপী সংবাদপত্র বা মুদ্রিত গণমাধ্যমের মন্দা চলছে। বিশেষ করে উন্নত পশ্চিমাবিশ্বে অনেক নামকরা পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেছে। দুটি পত্রিকা একীভূত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সম্প্রতি আমাদের  দেশ সহ অনেক দেশে অনেক পত্রিকার মুদ্রণ সংস্করণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অনেক খ্যাতনামা পত্রিকার প্রচার সংখ্যা কমে গেছে। এই প্রচার সংখ্যার সঙ্গে বিজ্ঞাপন ব্যবসার সম্পর্কটি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। পত্রিকা একটি বিক্রয়যোগ্য পণ্যও বটে। পাঠকের চাহিদা কমে গেলে এর বিক্রি কমে যায় আর বিক্রি কমে গেলে আয়ের প্রধান উৎস বিজ্ঞাপনও কমে যায়। মুদ্রিত দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হয় ২৪ ঘণ্টা পর, আর বৈদ্যুতিক ইলেকট্রনিক মাধ্যম প্রতি ঘণ্টায় এমনকি মিনিটে মিনিটে হালনাগাদ খবর পরিবেশন করে থাকে। তবে আনন্দের কথা, সাম্প্রতিক একাধিক জরিপ অনুযায়ী, বিশ্বের অন্যান্য স্থানে পত্রিকার পাঠক কমে গেলেও এশিয়ায় পাঠক কমেনি। বরং চীন ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশে পত্রিকার প্রচার সংখ্যা বেড়েছে। গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী ২০-২৫ বছর দক্ষিণ এশিয়ায় সংবাদপত্রের প্রচার সংখ্যা কমার আশঙ্কা নেই। এর সামাজিক, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ আছে। দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ অনেক বেশি রাজনীতি  সচেতন। একজন রাজনীতি সচেতন মানুষের জন্য কেবল তথ্য পাওয়াই যথেষ্ট নয়, তথ্যের সঙ্গে তিনি বিশ্লেষণ পেতে চান। অন্যের ভাবনার সঙ্গে নিজের ভাবনাকে মিলিয়ে নিতে চান। অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশের অর্থনীতি দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। শিক্ষার হার বাড়ছে। সেই সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার মান বেড়েছে, বেড়েছে জীবনযাপনের চাহিদাও। সে কারণে একজন পাঠক কেবল দেশ-বিদেশের খবর জানতেই পত্রিকা পড়েন না, তিনি তার দৈনন্দিন চাহিদা ও প্রয়োজনের বিষয়টি পত্রিকায় পেতে চান, যা বৈদ্যুতিক মাধ্যমে সব সময় সম্ভব হয় না। বাংলাদেশে বর্তমানে অসংখ্য টিভি চ্যানেল থাকলেও এর অভিগম্যতা কয়েকটি বড় শহর ও আশপাশের এলাকায়ই সীমিত। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারই ভরসা। সম্প্রতি বেসরকারি পর্যায়ে কয়েকটি এফএম রেডিও চালু হলেও তাও মেট্রোপলিটন এলাকার বাইরে যেতে পারেনি। সে ক্ষেত্রে এখনো বিশাল জনগোষ্ঠী সংবাদপত্রকেই তাদের একমাত্র তথ্য পাওয়ার এবং ভাবনা জোগানোর মাধ্যম বলে মনে করে। তা ছাড়া স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো দেখা যায়। অর্থাৎ এসব টিভি চ্যানেলের বাইরে যে বিশাল জনগোষ্ঠী আছে, তারা এর বাইরেই থেকে যাচ্ছেন। বাংলাদেশে বর্তমানে দৈনিক-সাপ্তাহিক মিলে পত্রিকার মোট প্রচার সংখ্যা মোটেও কম নয়। অথচ প্রতি বছর ১৫ থেকে ২০ লাখ শিক্ষিত তরুণ যুক্ত হচ্ছে। তাদের সবার হাতে এখনো পত্রিকা পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। অনেকে সামর্থ্যের অভাবে পত্রিকা কিনতে পারছে না, যে হারে মানুষের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা বাড়ছে, সেই হারে পত্রিকার পাঠক বাড়েনি। অর্থাৎ পত্রিকার পাঠক বাড়ানোর সুযোগ আছে। বাংলাদেশের পত্রপত্রিকাগুলো সনাতনী ধারায় পত্রিকার বিপণন করে থাকে, এখানে আধুনিক বিপণনব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে মোট পাঠক সংখ্যা দ্বিগুণ করা কঠিন নয়। পৃথিবীর কোনো দেশে এত বিপুলসংখ্যক জাতীয় দৈনিক প্রকাশিত হয় না, প্রকাশিত হয় আঞ্চলিক দৈনিক। অধুনা বাংলাদেশেও বেশ কিছু আঞ্চলিক দৈনিক পাঠকের মনে জায়গা করে নিয়েছে। কয়েক বছর আগেও হয়তো কমমূল্যে স্বল্পপৃষ্ঠার পত্রিকার কথা ভাবা যেত না, এখন দিব্যি চলছে। জাতীয় দৈনিকের তিলক তাদের কপালে নাই বা পড়ল? আরেকটি কথা, বাংলাদেশের মতো বিকাশমান সমাজে সংবাদপত্রগুলো শুধু সংবাদই পরিবেশন করে না। দেশের ও বহির্বিশ্বের রাজনীতি, কূটনীতি, অর্থনীতি, কৃষি পরিবেশসহ বিচিত্র বিষয়ে পাঠকের সঙ্গে মতের আদান-প্রদান করে। মানুষের মনের ও চিন্তার খোরাক জোগায়। পত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন নিবন্ধ প্রবন্ধ জনমত গঠনে বিশাল ভূমিকা রাখে। বৈদ্যুতিক মাধ্যমগুলো তাৎক্ষণিকতা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় তাদের পক্ষে যা অনেক সময়ই সম্ভব হয় না। তা ছাড়া অনুসন্ধিৎসু পাঠক দীর্ঘদিনের অভ্যাসের কারণে মানুষ রাতে টেলিভিশনে যে খবর দেখে, সেই খবরের বিস্তারিত, কিংবা খবরের পেছনের খবর দেখতে চান পত্রিকার পাতায়। এ কারণেই সংবাদপত্রকে তার সংবাদ পরিবেশনা ও বিশ্লেষণের ধরন পাল্টাতে হচ্ছে। পাঠকের চাহিদার কথা ভেবে সংবাদপত্রগুলো নিজেদের নবায়ন করছে, বহুমাত্রিক উপস্থাপনার দিকে মনোনিবেশ করেছে। দেশের প্রায় সংবাদপত্রই অনলাইন সংস্করণ প্রকাশ করছে, যাতে রেডিও টিভির মতো ঘণ্টায় ঘণ্টায় সংবাদ হালনাগাদ করার ব্যবস্থা থাকে। কোনো কোনো সংবাদপত্র তার খবর মুঠোফোনে দেখারও ব্যবস্থা করছে। সে ক্ষেত্রে মুদ্রিত গণমাধ্যমটি আর বিচ্ছিন্ন থাকছে না। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে রাজনৈতিক সংগ্রামের হাতিয়ার হিসেবেই সংবাদপত্র প্রকাশিত হতো। অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি রাজনৈতিক দলের মুখপত্র হিসেবে এর আবির্ভার ঘটত। উদাহরণ হিসেবে দৈনিক আজাদ ও ইত্তেফাকের নাম করা যায়। পরবর্তীকালেও পত্রিকাগুলো ঠিক দলের মুখপত্র থাকেনি। স্বীকার করতে হবে, ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারের পতনের পর গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় দেশের সংবাদপত্র পেশাদারিত্বের প্রতি অধিকতর মনোযোগ দেয়। রাজনীতি ছাড়াও অর্থনীতি, কৃষি, শিক্ষা, সংস্কৃতি তথা জনজীবনের চাওয়া-পাওয়ার প্রতি খবর গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশিত হতে থাকে। একই সঙ্গে সংবাদপত্র আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে, তাকে নবীন প্রতিযোগী বৈদ্যুতিক মাধ্যমের সঙ্গেও লড়াই করে চলতে হয়। ১৬ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ। শিক্ষার হার ৬০ শতাংশের বেশি। যদি আমরা ধরে নিই এর অর্ধেকসংখ্যক মানুষ পত্রিকা পড়তে পারে এবং তারও অর্ধেকের কেনার সামর্থ্য আছে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশে দৈনিক ও সাময়িক পত্রিকার সংখ্যা ১ কোটির বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু পাঠক আছে তারও কম। এখানে অনেক বেশি কাজ করার কথা। প্রতিবেশী পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষার হার বাংলাদেশের চেয়ে সামান্য বেশি হলেও লোক সংখ্যা ৯ কোটির মতো। অর্থনৈতিক অবস্থাও প্রায় এক। কিন্তু সেখানে আনন্দবাজার চলে ১৪ লাখেরও কম/বেশি। এ অবস্থাটি কি কেবল শিক্ষার হার, অর্থনৈতিক অবস্থার কারণেই হয়েছে? না আমাদের বিপণন ব্যবস্থার ত্রুটি আছে-সে বিষয়টিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অবশ্য অনেকে বলবেন, পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের তুলনায় এখানে পত্রিকার দাম অনেক বেশি। কিন্তু দামের সঙ্গে পৃষ্ঠা সংখ্যাও বেশি। যেখানে পশ্চিম বাংলায় কোনো পত্রিকা ৮-১২ পাতার বেশি চিন্তা করতে পারে না, বাংলাদেশের পত্রিকাগুলো সেখানে ৩২ পৃষ্ঠা কিংবা তার চেয়েও বেশি পৃষ্ঠা নিয়ে প্রকাশিত হয়। গণমাধ্যমে মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, সংকট ও সম্ভাবনার কথা বলে। বলে স্বপ্ন পূরণের কথা। আর বিশ্বায়নের যুগে গণমাধ্যমের সেই মানুষ কেবল দেশের সীমার ভেতরে থাকে না, সীমা ছাড়িয়ে বিদেশেও তার অবস্থান। বিশেষ করে যারা আমাদের নিকট প্রতিবেশী, যাদের সঙ্গে আমাদের ভাষার মিল আছে, তাদের কথা গণমাধ্যম কোনোভাবে উপেক্ষা করতে পারে না। এটি বাংলাদেশের যেমন তেমনি ভারতের গণমাধ্যমের জন্যও সমানভাবে সত্য
Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *